প্রশ্নঃ
ইসলামি মিডিয়ায় দ্বীনের দাওয়াতের নিয়তে যাকাত ফান্ড থেকে দান করা জায়েজ কিনা? আর যাকাত ফান্ড থেকে দ্বীনি অনুষ্ঠান এর জন্য প্রোডাকশন ইকুয়েপমেন্ট কেনা জায়েজ কিনা?
উত্তরঃ
যাকাতের আটটা খাতের একটা খাত হলো ফি সাবীলিল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদ, (সুরা আত-তাওবাঃ ৬০)। এর মানে শুধুমাত্র সশস্ত্র জিহাদই নয়। জিহাদ হলো ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ। মালের মাধ্যমেও জিহাদ হতে পারে। যেমনঃ অস্ত্র-শস্ত্র কেনা যায়। ঠিক তেমনি ইলমের মাধ্যমেও জিহাদ হয়। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন,
عَنْ أنسٍ، قالَ:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ، ﷺ: مَن خرَج في طَلَبِ العِلمِ، كان في سَبيلِ اللَّهِ حَتَّى
يرجِعَ. رواهُ
الترْمِذيُّ، وقال: حديثٌ حَسنٌ
“যে
ব্যাক্তি ইলম অর্জন এর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়, সে আল্লাহর রাস্তায় বা ফি
সাবিলিল্লাহ-তেই
থাকে, যতক্ষণ
পর্যন্ত আবার সে বাড়ি ফিরে না আসে।”(তিরমিযি)
ইলম যদি ফি সাবিলিল্লাহ এর অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে
ইলম প্রচারের জন্য, যেমনঃ
কিতাব পত্র, হ্যান্ডবিল, লিফলেট
ইত্যাদি ছাপাতে যাকাতের অর্থ থেকে ব্যায় করা বৈধ। একইভাবে
মানুষের কাছে মৌখিক ভাবে পৌছে দিতেও যা খরচ হয় সেটাও যাকাতের অর্থ থেকে ব্যায় করা
যাবে।
সুতরাং সাউন্ড সিস্টেম, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট এগুলো সব ফি সাবিলিল্লাহ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কেননা এগুলো সবই আধুনিক যুগে দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার বা প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এটা সরাসরি হাদীস থেকে পাওয়া যাবে না। ইজতিহাদের মাধ্যমে এগুলো ফতোয়াতে আনতে হবে। সমসাময়িক আলেম-ওলামারাও এগুলোকে ফি সাবিলিল্লাহ এর অন্তর্গত হিসেবে গন্য করছেন। শাইখ বিন উসাইমিন (রাহ.) বলেছেন, ঘর-দুয়ার করা যাবে কিনা, এ ব্যপারে সরাসরি হাঁ/না বলে এক্ষেত্রে আমি নীরবতা অবলম্বন করছি। তবে, ইলমের অন্যান্য খাতে যাকাত ফান্ড থেকে দান করা যাবে, সেটা এই খাতে ব্যবহার করা যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে অন্য আলেমরা বলেছেন, যেহেতু মুজাহিদদের জন্য ঘর-দুয়ার বানানো হতো, তাবু কেনা হতো, তাবু সরঞ্জামাদি বানানো হতো, ওগুলো বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর যোগ্য ছিল। তবে ইলম অর্জন এর ক্ষেত্রে এগুলো সাবিত, স্থির। ইলম অর্জন এর জন্য ঘর-দুয়ার বানানো জায়েজ আছে, বিশেষ ভাবে ওই সমস্ত দেশে, যেখানে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মূল ধন থেকে খরচ করতে অভ্যস্ত না এবং এই ব্যাপারে তাদের এখনো অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এই পরিবেশে যাকাতের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া উপায় নাই। আরব বিশ্বের আলেম-ওলামারা দাতাদেরকে উদ্ভুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন, তাই তারা যাকাতের টাকা ছাড়াও বিপুল পরিমাণ নিজেদের মূলধন থেকে খরচ করেন। কিন্তু সেরকম মন-মানষিকতা সম্পন্ন ধনাঢ্য অথবা সম্পদশালী ব্যক্তি আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। অতএব যাকাতের টাকা সর্ব ক্ষেত্রেই দাওয়াত, তাবলীগ, এবং দাওয়াত সংশ্লিষ্ট যত মাধ্যম, উপায়-উপকরণ রয়েছে, সব কিছুতেই ব্যবহার করা যাবে, ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا
كَافَّةً ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ
لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا
إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
“আর
সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন
বের হলো না, যাতে
দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সতর্ক করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে
প্রত্যাবর্তন করবে, যেন
তারা বাঁচতে পারে।” (সুরা আত-তাওবাঃ ১২২)
এই আয়াতের তাফসীরে পাওয়া যায়, আল্লাহর রাসূল (সাঃ)
মুমিনদেরকে দুইটা গ্রুপে ভাগ করেছে। দুই
দলের ভূমিকাকেই তিনি সমানভাবে মূল্যায়ন করেছেন। একটা হল মুজাহিদ গ্রুপ, তারা
সশস্ত্র জিহাদের পথে চলে যাবে, আরেকটা
গ্রুপ ইলম অর্জন করতে থাকবে। ইলম অর্জন এর মাধ্যমে তারা উপকৃত করবে জাতি ও
দ্বীনকে। সুতরাং যে দেশে সাধারণ মানুষের
মধ্যে দ্বীনি ইলমের যথেষ্ট ঘাটতি আছে, সেই দেশে, যেমন
বাংলাদেশে, দ্বীনের
পথে, দ্বীনের
দাওয়াতে, ইলম
প্রচারের জন্য যাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে। এতে কোনো সমস্যা নাই।
উত্তর প্রদানে,
শাইখ আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম